হাত-পা সব সময় ঠান্ডা থাকে কেন?
অনেক মানুষই অভিযোগ করেন—আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলেও তাঁদের হাত-পা সব সময় ঠান্ডা লাগে। কখনও এটি সাময়িক সমস্যা হলেও, কখনও আবার শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। এই প্রতিবেদনে হাত-পা ঠান্ডা থাকার প্রধান কারণ, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং কার্যকর প্রতিকার বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
হাত-পা ঠান্ডা থাকার প্রধান কারণ:-
১. রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা
হাত-পা ঠান্ডা থাকার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো রক্ত সঞ্চালন ঠিকমতো না হওয়া। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্ত সরবরাহ আগে হয়, ফলে হাত ও পায়ের মতো প্রান্তীয় অংশে রক্ত কম পৌঁছালে সেগুলো ঠান্ডা লাগে।
কারণ হতে পারে—
দীর্ঘ সময় বসে বা শুয়ে থাকা
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
ধূমপান (রক্তনালি সংকুচিত করে)
২. রেনোডস ডিজিজ (Raynaud’s Phenomenon)
এটি একটি বিশেষ অবস্থা, যেখানে ঠান্ডা বা মানসিক চাপের কারণে হাত ও পায়ের রক্তনালি হঠাৎ সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে হাত-পা খুব ঠান্ডা হয়ে যায় এবং কখনও আঙুল সাদা বা নীলচে রঙ ধারণ করে।
লক্ষণ-
হঠাৎ আঙুল সাদা/নীল হওয়া
ঝিনঝিন ভাব বা ব্যথা
ঠান্ডায় সমস্যা বাড়ে
৩. রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া)
শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পরিবহন সম্ভব হয় না। এতে হাত-পা ঠান্ডা লাগার পাশাপাশি দেখা দিতে পারে—
দুর্বলতা
মাথা ঘোরা
শ্বাস নিতে কষ্ট
৪. থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা
বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজমে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। ফলে শরীর পর্যাপ্ত তাপ উৎপন্ন করতে পারে না।
অন্যান্য লক্ষণ
ওজন বেড়ে যাওয়া
ত্বক শুষ্ক হওয়া
অতিরিক্ত ক্লান্তি
৫. কম ওজন বা অপুষ্টি
যাদের শরীরে চর্বির পরিমাণ কম, তাঁদের শরীর তাপ ধরে রাখতে পারে না। অপুষ্টি বা দীর্ঘদিন কম খাওয়ার ফলেও হাত-পা ঠান্ডা থাকতে পারে।
৬. স্নায়বিক সমস্যা
ডায়াবেটিস বা স্নায়ুর ক্ষতির কারণে হাত-পায়ে রক্তপ্রবাহ ও অনুভূতি কমে যেতে পারে, ফলে ঠান্ডা অনুভব হয়।
৭. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপের সময় শরীর “স্ট্রেস মোড”-এ চলে যায়, তখন হাত-পায়ের রক্তনালি সংকুচিত হয়।
কখন সতর্ক হবেন?
নিচের লক্ষণগুলোর সঙ্গে যদি হাত-পা ঠান্ডা থাকে, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলতে থাকলে
হাত-পা ব্যথা, অসাড়তা বা রঙ পরিবর্তন হলে
অতিরিক্ত দুর্বলতা বা ওজন হঠাৎ কমে গেলে
হাত-পা ঠান্ডা থাকার প্রতিকার
১. নিয়মিত ব্যায়াম:
হালকা হাঁটা, যোগব্যায়াম বা স্ট্রেচিং রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শরীরচর্চা উপকারী।
২. সুষম খাদ্য গ্রহণ:
খাবারে রাখতে হবে—
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার (সবুজ শাক, ডাল, কলিজা)
ভিটামিন বি১২ ও ফলিক অ্যাসিড
পর্যাপ্ত প্রোটিন
৩. গরম থাকার ব্যবস্থা:
ঠান্ডায় মোজা ও গ্লাভস ব্যবহার করুন
শীতে হালকা গরম পানিতে হাত-পা ধুতে পারেন
৪. ধূমপান ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন পরিহার:
এসব রক্তনালি সংকুচিত করে, ফলে সমস্যা বাড়ে।
৫. মানসিক চাপ কমান
মেডিটেশন, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
৬. প্রয়োজন হলে চিকিৎসা
যদি থাইরয়েড, অ্যানিমিয়া বা ডায়াবেটিসজনিত কারণ থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা জরুরি।
উপসংহার
হাত-পা সব সময় ঠান্ডা থাকা অনেক সময় স্বাভাবিক হলেও, এটি শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সচেতনতা অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান করে। তবে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলে অবহেলা না করে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
👉 স্বাস্থ্য সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন।

Comments
Post a Comment