ডায়াবেটিস কত হলে নরমাল?
ডায়াবেটিস মেলিটাস একটি দীর্ঘমেয়াদি (Chronic) অসংক্রামক রোগ, যেখানে শরীরে ইনসুলিনের অভাব বা ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ না করার কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাই রক্তে শর্করার নরমাল মাত্রা কত, কখন সতর্ক হতে হবে এবং কখন ডায়াবেটিস ধরা হয়—এসব জানা অত্যন্ত জরুরি।
১. ব্লাড সুগার কী?
আমরা যে খাবার খাই, তা হজম হয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয়। এই গ্লুকোজই রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে শক্তি জোগায়।
👉 ইনসুলিন হরমোন গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
👉 ইনসুলিন কম হলে বা কাজ না করলে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যায়—এটাই ডায়াবেটিস।
২. নরমাল ব্লাড সুগার কত?
একজন সুস্থ, ডায়াবেটিসবিহীন মানুষের ব্লাড সুগারের আদর্শ মাত্রা নিচে দেওয়া হলো—
(ক) খালি পেটে (Fasting Blood Sugar – FBS)
৭০–৯৯ mg/dL → নরমাল
সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছু না খেয়ে এই পরীক্ষা করা হয়
(খ) খাবারের ২ ঘণ্টা পরে (Post Prandial – PP)
১৪০ mg/dL এর নিচে → নরমাল
(গ) যেকোনো সময় (Random Blood Sugar – RBS)
২০০ mg/dL এর নিচে → সাধারণত নরমাল
(ঘ) HbA1c
৫.৭% এর নিচে → নরমাল
এটি শেষ ৩ মাসের গড় ব্লাড সুগার নির্দেশ করে
👉 উপরের সব মান স্বাভাবিক থাকলে একজন মানুষকে ডায়াবেটিস নেই (Non-diabetic) বলা হয়।
৩. প্রি-ডায়াবেটিস কী?
প্রি-ডায়াবেটিস হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কিন্তু ডায়াবেটিস হওয়ার মতো বেশি নয়।
পরীক্ষা প্রি-ডায়াবেটিস
খালি পেটে ১০০–১২৫ mg/dL
২ ঘণ্টা পরে ১৪০–১৯৯ mg/dL
HbA1c ৫.৭% – ৬.৪%
👉 এই পর্যায়ে জীবনযাপন পরিবর্তন করলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
৪. ডায়াবেটিস কত হলে নিশ্চিত ধরা হয়?
নিচের যেকোনো একটি মান পাওয়া গেলে ডায়াবেটিস ধরা হয়—
পরীক্ষা ডায়াবেটিস
খালি পেটে ≥ ১২৬ mg/dL
২ ঘণ্টা পরে ≥ ২০০ mg/dL
Random (লক্ষণসহ) ≥ ২০০ mg/dL
HbA1c ≥ ৬.৫%
৫. ডায়াবেটিসের লক্ষণ
ডায়াবেটিস হলে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়—
ঘন ঘন প্রস্রাব
অতিরিক্ত পিপাসা
অস্বাভাবিক ক্ষুধা
ওজন কমে যাওয়া
দুর্বলতা ও ক্লান্তি
ক্ষত শুকাতে দেরি
চোখে ঝাপসা দেখা
👉 তবে অনেক সময় লক্ষণ ছাড়াই ডায়াবেটিস থাকতে পারে, তাই পরীক্ষা জরুরি।
৬. HbA1c পরীক্ষার গুরুত্ব
HbA1c হলো ডায়াবেটিস নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
HbA1c মান অর্থ
< ৫.৭% নরমাল
৫.৭–৬.৪% প্রি-ডায়াবেটিস
≥ ৬.৫% ডায়াবেটিস
< ৭% নিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
৭. ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নরমাল বা টার্গেট সুগার কত?
ডায়াবেটিস থাকলেও নিয়ন্ত্রণে থাকলে নিচের মানগুলো গ্রহণযোগ্য—
খালি পেটে: ৮০–১৩০ mg/dL
খাবারের ২ ঘণ্টা পরে: ১৮০ mg/dL এর নিচে
HbA1c: ৭% এর নিচে
(বয়স, গর্ভাবস্থা ও অন্যান্য রোগ অনুযায়ী লক্ষ্য ভিন্ন হতে পারে)
৮. ডায়াবেটিসের প্রকারভেদ
1. টাইপ–১ ডায়াবেটিস – ইনসুলিন তৈরি হয় না
2. টাইপ–২ ডায়াবেটিস – ইনসুলিন কাজ করে না বা কম কাজ করে
3. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস – গর্ভাবস্থায় হয়
4. সেকেন্ডারি ডায়াবেটিস – অন্য রোগ বা ওষুধের কারণে
৯. ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত হলে ক্ষতি
হৃদরোগ ও স্ট্রোক
কিডনি বিকল
চোখে অন্ধত্ব
স্নায়ু ক্ষতি
পা কেটে ফেলার ঝুঁকি
১০. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করণীয়
নিয়মিত ব্লাড সুগার পরীক্ষা
চিনি ও সাদা ভাত কমানো
শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া
প্রতিদিন হাঁটা/ব্যায়াম
ওজন নিয়ন্ত্রণ
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ/ইনসুলিন
উপসংহার
খালি পেটে ৭০–৯৯ mg/dL এবং খাবারের ২ ঘণ্টা পরে ১৪০ mg/dL এর নিচে থাকলে ব্লাড সুগার নরমাল।
এর বেশি হলে ধাপে ধাপে প্রি-ডায়াবেটিস ও ডায়াবেটিস ধরা হয়। সময়মতো সচেতন হলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ—দুটোই সম্ভব।

Comments
Post a Comment